ডিউক জনের চার মূর্তি সিরিজের গল্প—দুঃসহ দুপুরে
গল্প

ডিউক জনের চার মূর্তি সিরিজের গল্প—দুঃসহ দুপুরে

saet

‘বাপরে, গরম কী!’ লেখার প্যাড দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে বলল একহারা শরীরের পাতলা-সাতলা দীপ্র চৌধুরী, ‘তো, আজ দুপুরে কী করছি আমরা?’ ফরসা মুখভরা লাল লাল ফুটকি ওর। খাড়া মইয়ের মতো শরীরটায় প্রথমেই চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে বেরিয়ে থাকা কণ্ঠার হাড়। বাঁকানো নাকটা যেন বাজপাখির ঠোঁটের মতো তীক্ষ্ণ।

‘কিচ্ছু না!’ জবাব দিতে একমুহূর্তও দেরি হলো না আদনান রেজার, ‘এত্ত গরম পড়েছে যে মনে হচ্ছে গলে যাচ্ছি আইসক্রিমের মতো! সাঁতার কাটতে যেতেও ইচ্ছে করছে না এখন।’ ওর কপালের ওপর ঝুলে পড়া কয়েক গোছা কোঁকড়া চুল জন্ম থেকেই ধবধবে সাদা। শ্যামলা ছেলেটির চোখের মণি দুটো যেন দুফোঁটা গাঢ় বাদামি কফি। রাজ্যের মায়া খেলা করছে ডাগর চোখের তারায়। বুদ্ধির দীপ্ত ঝিলিকও রয়েছে তাতে।

‘বেশ তো, অলস দুপুরই কাটালাম নাহয় আজকের দিনটা।’ সায় জানাল সুঠামদেহী পাভেল রোজারিও, ‘এই গরমে বাইরে ঘোরাঘুরি কিংবা সাইকেল চালানোর কথা চিন্তা করলেই চক্কর দিয়ে উঠতে চায় মাথাটা!’

‘হুফ!’ কুটুস যেন দ্বিমত করল কথাটায়।

‘ও তো মনে হয় হাঁটতে যাওয়ারই প্রস্তাব দিচ্ছে, পাভেল।’ হেসে বন্ধুর পোষা কুকুরের সোনালি মাথাটা চাপড়ে দিল ছোটখাটো গড়নের মুকিত ইকবাল। পুরু ফ্রেমের কালো চশমাটা খুলে ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইল, ‘এবার?’ স্বাস্থ্য ভালোর দিকে ওর, তবে মোটা বলা যাবে না মোটেই। গোলগাল মুখটার ওপর চুলগুলো খাটো করে ছাঁটা।

‘তবে আর কী!’ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল পাভেল, ‘ঠান্ডা, ছায়া আছে—এ রকম কোনো জায়গা খুঁজে বের করিগে, চলো। গল্পের বইটই খুলে বসি, অথবা ঘুম দিই লাঞ্চের সময় হওয়ার আগপর্যন্ত। আশা করি, মন্দ কাটবে না সময়টা।’

‘হুফ! হুফ!’ আবার ডেকে উঠল গোল্ডেন স্প্যানিয়েল প্রজাতির কুকুরটা। এটাতেও রাজি নয় যেন।

‘হ্যাঁ, এটা অন্তত করতে পারি আমরা।’ উঠে দাঁড়াল দীপ্র।

‘যাওয়া যাক তাহলে।’ দেখাদেখি উঠে পড়েছে আদনানও, ‘গাছ খুঁজতে হবে বড় বড় পাতাওয়ালা। আর ধারেকাছে ঝরনাটরনা থাকলে তো কথাই নেই।’

বাড়ি থেকে বেরিয়ে ধীর কদমে হাঁটতে লাগল চার বন্ধু। ভ্যাপসা গরমের কারণে তাল মেলাতে পারছে না উৎসাহী, চঞ্চল চারপেয়েটার সঙ্গে।

ক্যালিফোর্নিয়ার নিষ্ঠুর সূর্যটা অবিরাম আগুন ঢালছে মাথার ওপর। নিচের মানুষগুলোকে একচুলও ছাড় দেবে না—এমন একগুঁয়ে জেদ যেন ওটার। এক টুকরো মেঘ নেই আকাশে। গাছগাছালির ছায়াও নেই আশপাশে। প্রচণ্ড গরমে অশরীরী প্রেতাত্মার মতো তাপতরঙ্গ নেচে চলেছে চোখের সামনে। একটুও বাতাস নেই কোত্থাও।

শহরের কোলাহল থেকে দূরে, আধা গ্রাম, আধা শহরের এক নিরিবিলি এলাকায় গড়ে উঠেছে এই বাঙালিপল্লি। বাড়িঘরগুলো দূরে দূরে ছড়ানো হলেও মানুষের মনগুলো কিন্তু কাছাকাছি। সবার সঙ্গে সবার আন্তরিক সম্পর্ক। আপদে-বিপদে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ানোটা যেন এখানকার অলিখিত নিয়ম। এ পাড়াতেই থাকে মুকিত, দীপ্র, আদনান আর পাভেল। হরিহর আত্মা যেন চার কিশোর।

‘ওর দিকে তাকালেই তো গরম লাগছে আমার!’ অনুযোগ করল মুকিত, ‘কীভাবে হাঁপাচ্ছে ও, দেখো! এক্কেবারে আদ্যিকালের স্টিম ইঞ্জিনের মতো! ওরে, জিবটা ভেতরে ঢোকা রে, কুটুস সোনা! পোকা ঢুকে যাবে তো মুখ দিয়ে!’

উৎফুল্ল কুটুস দৌড়ে যাচ্ছিল আগে আগে; মনে করেছিল যে পায়চারি করতেই বেরিয়েছে ওর মানববন্ধুরা। যখন দেখল, ক্ষীণ এক স্রোতস্বিনীর কাছাকাছি বিশাল এক গাছের ছায়ায় যাত্রাবিরতি নিল ওরা, যারপরনাই হতাশ হলো কুকুরটা। বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বন্ধুদের দিকে।

‘সরি, কুটুস, আজ আর হাঁটা নয়।’ প্রাণীটার মনোভাব বুঝতে পেরে বলল পাভেল, ‘আয়, তুইও বোস আমাদের সাথে। গরমের মধ্যে আর খরগোশের পেছনে ছোটাছুটি করিস না।’

‘হ্যাঁ রে...সময়ই নষ্ট হবে শুধু।’ বন্ধুর কথায় সমর্থন জানাল আদনান, ‘বুদ্ধিমান খরগোশগুলো নিশ্চয়ই গর্তের মধ্যে ভাতঘুম দিচ্ছে এতক্ষণে, গরমটা কমলে পরে বেরোবে।’

‘খরগোশ কি ভাত খায় নাকি?’ ফিচেল হেসে কথাটা ধরল ভোজনরসিক মুকিত।

‘আরে, ওই আরকি...।’

‘হউফ!’ গাছপালা আর ঝোপের ছায়ায় চারজনকে জুত হয়ে বসতে দেখে অননুমোদনের সুরে ডেকে উঠল কুকুরটা। পাতা আর ডালের ঠাসবুনটের কারণে সূর্যের আলো একেবারেই পৌঁছাচ্ছে না গাছের নিচে। ফলে সবুজ ছায়ার আদরমাখা প্রশান্তি বিরাজ করছে নিচটায়।

‘হুম, এটাই সবচেয়ে ভালো জায়গা।’ মন্তব্য করল আদনান, ‘সবচেয়ে ঠান্ডাও বোধ হয় এই জায়গাই। পাথরে বাধা পেয়ে ঝিরির পানি কী রকম আওয়াজ তুলছে, শুনছ না?’

‘হ্যাঁ, শুনেই তো ঘুম এসে যাচ্ছে!’ আসলেই ঢুলুঢুলু হয়ে এসেছে মুকিতের চোখ দুটো। চারপেয়ে প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলি, কুটুস, আমরা কিন্তু বিশ্রাম নেব এখন। বেশি যদি লাফালাফি করিস, কান ধরে বাসায় রেখে আসব তোকে!’

শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কুকুরটা। লেজটা ঝুলে পড়েছে নিচের দিকে। বনজঙ্গলে এসে কিচ্ছুটি না করে এভাবে শুয়ে-বসে থাকার মানেটা কী, মাথায়ই ধরছে না ওটার। ঠিক করল, যে যা-ই বলুক ওরা, খরগোশই খুঁজতে বেরোবে সে!

ঘুরে দাঁড়াল জানোয়ারটা, অচিরেই অদৃশ্য হয়ে গেল ঝোপের ওপাশে।

আধশোয়া বন্ধুরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল ওটার চলে যাওয়া।

‘খরগোশই খুঁজতে গেল, তাই না?’ বলে উঠল দীপ্র ।

‘থাকগে, যেতে দাও।’ হাত নাড়ল পাভেল, ‘দেখবে, ঠিকই ফিরে আসবে আবার জায়গা চিনে।’

‘উফ, এত বকবক কোরো না তো!’ আস্তে করে বন্ধুর পায়ে লাথি মারল মুকিত, ‘এখানকার বাতাসে মনে হয় ঘুমের ওষুধ আছে...কিছুতেই চোখ খুলে রাখতে পারছি না আমি!’

সত্যিই তা-ই। মিনিট কয়েক পরই দেখা গেল, চোখ খোলা নেই একজনেরও। পেপারব্যাক বইগুলো সঙ্গে আনাই সার, পড়া হয়নি একটা পৃষ্ঠাও। ছোট্ট একটা নীল রঙের পোকা মুকিতের অনাবৃত পায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে গেল, টেরই পেল না ও। একটা রবিন পাখি এসে বসল ওপরকার ডালে, জানতেও পারল না চার মূর্তি।