চোখের চামড়া
‘টিকটিকি’ কামালের গোয়েন্দা গল্প
স্থান: কীর্তিমারী সদর থানার ইন্সপেক্টরের কামরা।
কাল: বিকেলবেলা।
পাত্র: ইন্সপেক্টর রইস আর তার সোর্স কামাল। রইস পুরোনো মেহগনির টেবিলটার ওপারে চেয়ারে বসা আর কামাল দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। দুজনেরই এটা চিরাচরিত ভঙ্গি, তোমরা কখনো কীর্তিমারী জেলা শহরে হাজির হলে ওদের এভাবেই পাবে।
রইস লম্বা-চওড়া বিশালবপু লোক, ঠোঁটের ওপরে জাঁদরেল গোঁফটা তাকে মানিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ভুরু কুঁচকে আঙুল মটকাচ্ছে সে। কামাল শুকনা-পাতলা একহারা গড়নের, কাপড়চোপড় পুরোনো, কিন্তু পরিষ্কার। মাথায় এলোমেলো চুলের বোঝা। কেবল ঝকঝকে ক্ষুরধার চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায়, নিম্নবিত্ত এই লোক আর সবার মতো নয়। পুলিশের সোর্স বা সাহায্যকারী হিসেবে ‘টিকটিকি’ নামে পরিচিত কামাল এরই মধ্যে অনেকগুলো জটিল রহস্যের সমাধান করে ফেলেছে।
রইসের মেজাজ ভালো নেই, গভীর চিন্তায় মগ্ন সে। এটা বুঝেই চুপ করে আছে কামাল। তবে রইস যখন তার দিকে তাকাল, সেই চাউনিতে একটু কিন্তু-কিন্তু ভাব আবিষ্কার করে কামাল সামান্য অবাক হলো বটে।
‘কামাল, দেখ, তোর অতীত নিয়ে আমি খুব একটা ঘাঁটতে চাই না, সেটা তুই জানিস,’ ভূমিকা শুরু করল রইস, ‘কিন্তু এবারে একটু নাড়াচাড়া দিতে হবে।’
বস কিসের কথা বলছে, কামালের তা ভালোই জানা আছে। প্রসঙ্গটা তার জন্য সুখের নয়, কিন্তু বিনা কারণে নিশ্চয়ই রইস এটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে না। কিছু না বলে চুপচাপ তাকিয়ে রইল সে, কান খাড়া।
‘তুই তো একসময়...বর্ডারে স্মাগলিংয়ের খোঁজ রাখতি।’ রইস বলেই ফেলল, ‘এখনো নিশ্চয়ই তোর চেনাজানা অনেক লোক সেটা করে। তোকে ওই দিকটা নিয়ে একটু খবর বের করতে হবে আরকি।’
কথা সত্য। পুলিশের বেশির ভাগ সোর্সই কোনো না কোনোভাবে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা আছে। কামাল একসময় সেটাই করত, যেটার বিষয়ে জানতে চাইছে রইস। অবশ্য বহু দিন হলো ওই জগৎ ছেড়ে এসেছে ও। কিন্তু তাই বলে যোগাযোগগুলো তো আর মরে যায়নি, আর সেটার কথাই বলছে ইন্সপেক্টর রইস।
‘চোরাচালান খুব বেড়ে গেছে।’ রইস যা বলল, সেটা কীর্তিমারীতে নতুন কোনো বাক্য নয়। সীমান্তবর্তী জেলা কীর্তিমারী, স্মাগলিং আছে এবং থাকবে। কামাল, যে কীর্তিমারীর সবার হাঁড়ির খবর রাখে, তাকেও এ কথা এমনি এমনি বলার কোনো মানে হয় না। পরের কথায় অবশ্য বিষয়টা খানিক খোলাসা করল রইস, ‘এমনিতে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নাই। কাস্টমস আর স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এবারে শুধু শাড়ি-ওষুধ-চিনি আসছে না। এবারে পণ্যের মান আরেক ধাপ উন্নত করেছে ওরা। বিপুল পরিমাণে মাদক পাঠাতে শুরু করেছে। আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী ডার্ক ব্যাট আছে এর পেছনে। জানিস তো, তার পরিচয় এখনো অজানা।’
মাথা ওপর-নিচ করল কামাল। এটাও তার জানা। বেশ কিছুদিন হলো শহরের ভেতরেই ব্যস্ত সে রইসের সঙ্গে, বর্ডারের দিকে যাওয়া হচ্ছে না, কিন্তু বাজারে এই নতুন উৎপাত ওর চোখ এড়ায়নি। কামাল নিজে অন্ধকার জগতের খুব কাছাকাছি থাকে বলে জানে, বাজারে কোনো নেশার চালান বেড়ে গেলে কী কী পরিবর্তন দেখা যায়। সেসব লক্ষণ কিছুদিন হলো খুব চোখে পড়ছিল তার, কিন্তু সময়ের অভাবে মনোযোগ দিতে পারেনি বিষয়টাতে।